তুমি আমি উদাস মনে যতই থাকি চুপ! অনলাইনে ভেসে আসে শ্বাশত বাংলার রূপ!!

প্রকাশের সময় : 2019-08-28 16:56:25 | প্রকাশক : Administration তুমি আমি উদাস মনে যতই থাকি চুপ!  অনলাইনে ভেসে আসে শ্বাশত বাংলার রূপ!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ধরাশায়ী হয়েছিলাম বছর তিনেক আগে। কেবল আমি নই; আমার শোনিমও আক্রান্ত হয়েছিল। কঠিনভাবে আক্রান্ত। জীবনে এর আগে এত বেশী আক্রান্ত কখনো হইনি; আর এত বেশী কাবুও হইনি কোন রোগে। রোগ মানে মহা রোগ; ব্যাথার রোগ। মাথা থেকে পা পর্যন্ত টনটনে ব্যাথা। সারা শরীরের গিরায় গিরায়, জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যাথা। উহ্, আহ্ ছাড়া মুখে আর কোন কথা নেই। অবস্থা বড়ই বেগতিক। ক্ষুদ্রকায় সামান্য একটি মশার কামড়ে দীর্ঘকায় অসামান্য মানবকুলের কঠিন অসহনীয় অবস্থা। রিমান্ডে নেয়া আসামীর মত অবস্থা।

হাতুরী দিয়ে হাড়ের প্রতিটি জোড়ায় পেটাবার পর নতুন চোরের যে অবস্থা হয়, আমার অবস্থা হয়েছিল ঠিক তেমন। চেহারায় মাইর খাওয়া চোরের ভাব পুরোপুরি এসে গেছে। চোখের নীচে কালি; শরীরে সামান্য শক্তি নেই। বিছানায় পরে থেকেও শরীর নড়াবার জোঁ নেই। অচল প্রায় অবস্থা। কারো সাহায্য ছাড়া হাঁটতেও পারি না। ধরে ধরে হাঁটতে হয়। বলা চলে প্যারালাইসিস রোগীর মত অবস্থা। সে সব অবস্থার কথা এখনো মানসপটে ভাসে। অকল্পনীয় কষ্ট নিয়েই ভাসে।

ভাসলেই সারা শরীর আবার শিউরে ওঠে। দৃশ্যমান হয় প্রতিটি কষ্টের ক্ষণ; কষ্টের অনুভূতি। অবশ্য আজো এর রেশ কাটেনি। বাকী জীবন কাটবে বলেও মনে হয় না। এখনও কিছু একটা হলেই, সেটা স্বাভাবিক জ্বর কিংবা সর্দি; খবর হয় অন্য জায়গায়। সারা শরীরে ব্যাথা অনুভূত হয়। চিকনগুনিয়ার ব্যাথা। আমার বিশ্বাস চিকনগুনিয়ার জীবাণু মরে না। শরীরে লুকিয়ে থাকে। আর সুযোগ পেলেই চেপে ধরে। বিশেষ করে  আমাকে মাঝে মধ্যেই ধরে। এটা সবার বোঝার কথা না। যাদের হয়েছে কেবল তারাই বুঝবে। 

ভাগ্যবানরা বুঝবে না। তাদের চিকনগুনিয়া হয়নি। যেমন ভাগ্যক্রমে আমার ডেঙ্গু হয়নি; তাই ডেংগুর কষ্ট বুঝি না। তবে আমি না বুঝলেও এবার বুঝেছে আমার দেশ। কেবল বাংলাদেশ নয়। বিশ্বের একটা বড়  অংশই বুঝেছে। বেশী বুঝেছে ফিলিপাইন এবং মালয়েশিয়া। ফিলিপাইনে মহামারীর মত আক্রান্ত হয়েছে ডেঙ্গু। মানুষও মারা গেছে প্রায় সাত শতাধিক। মালয়েশিয়ায়ও কম হয়নি। প্রায় দু’শ মানুষ হারিয়েছে ওরা। চিকনগুনিয়ার মতই ক্ষুদ্রকায় সামান্য এডিস মশা হুট করে বিস্তর ছড়িয়েছে। প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি নিতে নিতেই ঝরে গেছে অনেক অনেক প্রাণ।

বাংলাদেশেও ঝরেছে। এবং সার্বিক পরিস্থিতি বেশ খারাপই হয়েছে। যদিও বা অন্য দেশের মত মহামারী আকারে হয়নি। কিন্তু দেশের সোস্যাল মিডিয়া তথা ফেসবুকে তথাকথিত সচেতন সমাজের আহাজারী আর আর্তনাদ দেখে তা মনে হয়নি। মনে হয়েছে দেশে মহামারী তো ভাল, পুরো দস্তুর গজব নেমেছে।

স্বয়ং উপরওয়ালার গজব। এবং সৃষ্টিকর্তার এহেন গজবীয় বিচারে তারা পরম ভাবে পুলকিত, নরম ভাবে উদ্বেলিত আর চরম ভাবে উজ্জীবিত হয়ে গজবের আরো বিস্তার চেয়েছে।

এই ছিল সোস্যাল মিডিয়ায় তাদের এঁকে দেয়া বাংলার রূপ। তাদের সকল কামনা, বাসনা এবং আকাঙ্খার লক্ষ্যস্থল ছিল প্রশাসন তথা সরকারের বিনাশ। এই বিনাশ সাধনে দেশের ক্ষতি হয় হোক, জাতির জান যায় যাক। তাতে বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। মাথাভর্তি ভাবনা কেবল সরকারকে বিপদে দেখা। জাতি বিপদে পড়েছে কি না এটা দেখার বিষয় না। সরকার বিপদে পড়েছে এটাই বড় কথা; বড়ই আনন্দের কথা। তবে নিঃসন্দেহে এসব সবার কথা না। সবাই এমন ছিল না। সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকৃত দেশপ্রেমিকের উঁকিঝুকি কিংবা আহাজারিও ছিল। কিন্তু সংখ্যায় তারা নগন্য। যেখানেই তারা বিষয়টিকে বাস্তবতার নিরিখে বলার চেষ্টা করেছেন সেখানেই হামলে পড়েছে বাকীরা।  

হামলে পড়ার মত যথেষ্ঠ কারণও ছিল। সরকারের লোকজনেরাই সেই কারণ হাতে তুলে দিয়েছে। প্রতিকী গণসচেতনতার নামে পরিস্কার জায়গায় ময়লা ফেলে সরকারের মন্ত্রী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যেভাবে নাটক করেছেন কিংবা পরিচ্ছন্ন মহাসড়কে ঝাড়ু দেবার নামে ঝাড়ুকে শুণ্যে তুলে যেভাবে টোক্কাটুক্কি খেলেছেনে তা খুবই বাজে ছিল। যদিও গা বাঁচাতে প্রতিকী আয়োজনের দোহাই দিয়েছেন। কিন্তু আয়োজনটা যতই প্রতিকী হোক, প্রয়োজনটা তো প্রতিকী ছিল না। প্রতিকী আয়োজনটা তো তারা সত্যি সত্যি পরিচছন্নতা অভিযানে নেমেও  দেখাতে পারতেন।

পারেননি। পেরেছেন ফাজলামো করতে। প্রতিকী আয়োজনের নামে জাতির সঙ্গে জাস্ট ফাজলামো করেছেন। ফাজলামো তো বটেই। বন্যার পানিতে না নেমে, বন্যা কবলিত এলাকায় না যেয়ে ছিমছাম, নিরিবিলি দশ তলার ছাদে বসে ত্রাণ বিলানোর নাটক করলে জাতি বিষয়টিকে ফাজলামোর চোখেই দেখবে। ডেঙ্গু নিয়ে প্রতিকী আয়োজনের নামে ঠিক এমনটিই হয়েছে। এবং জাতি তেমনটিই দেখেছে। তবে কেবল একপক্ষকে নয়, দু’পক্ষকেই দেখেছে। তথাকথিত ফেসবুকওয়ালাদেরও দেখেছে। এক পক্ষ তো তবুও মাঠে নেমে ঝাড়ু হাতে ফাজলামো করেছে। অন্যপক্ষ মাঠেই নামেনি। ঘরে বসে মোবাইল হাতে ফেসবুকিং করেছে। যেটা ফাজলামো করার চেয়েও খারাপ।

ওদের কপালও খারাপ। কোন একটি ইস্যু নিয়ে বেশীদিন থাকতে পারে না। ইস্যুটা আটঘাঁট বেঁধে জমতে না জমতেই হাত ছাড়া হয়ে যায়। নতুন ইস্যু সামনে আসে। অগত্যা পুরানোটা ভুলে সবাই নতুনটাকেই লুফে নেয়। ডেঙ্গু নিয়ে মাঠ গরম হতে না হতেই ভারতের মোদী বাবু গনেশ উল্টে দিলেন। কাশ্মীর নিয়ে আঁতকা বোমা ফাটালেন। আর যায় কোথায়! কিসের ডেঙ্গু, কিসের কী? ফেইসবুকের টাইম লাইন ভরে গেল কাশ্মীর আর কাশ্মীরে। বাঙালীর কাছে দেশীয় সমস্যার চেয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার গুরুত্ব বেশী। তাই ডেঙ্গু হাওয়া। কোথায়ও ডেঙ্গু নেই। ফেসবুক দেখে বোঝারই উপায় নেই কাশ্মীর নয়, এডিস মশা তখনও বাঙ্গালীকে ইচ্ছেমত কামড়ে যাচ্ছে।

কাশ্মীরের ধাক্কায় দেশের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কামড়াকামড়িটাও হালে পানি পায়নি। তবে চেষ্টা হয়েছিল। ফেসবুকাররা নড়েচড়ে বসেছিলেন। একটা চমৎকার সাবজেক্ট পেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। রিয়েলিটি শো সারেগামায় সদ্য সেলিব্রিটির তকমা পাওয়া নোবেল অজ্ঞাত  কারণে  ইস্যুটা ধরিয়ে দেন ফেসবুকারদের। বেচারা নোবেল! ফেসবুকে নিজের স্ক্যান্ডেল নিয়ে চলা ভাইরালে নজর নেই। নজর তার জাতীয় সঙ্গীতে। বস্তুত হঠাৎ করে পাওয়া মঞ্চ আর ক্যামেরার একশান ছেলেটার মাথা গুলিয়ে দেয়। আর ভুলিয়ে দেয় গানের জোর আর জ্ঞানের জোরের পার্থক্য। দুটো যে এক জিনিস না, এটা বুঝতে নোবেলকে বহু পথ হাঁটতে হবে। বহু কিছু জানতে হবে।

কোন কিছু ভাল করে না জেনে লিখতে ওস্তাদ বেশীরভাগ ফেসবুকার। জীবনে পত্র লেখার অভিজ্ঞতাও যাদের নেই তারাই আজকাল লেখক সেজেছেন। দেশে এখন ঘরে ঘরে লেখক; জনে জনে লেখক। খোলা ময়দানে যা খুশী লিখে যাচ্ছেন অবলীলায়। লিখছেন আর পোস্ট দিচ্ছেন। এতে সমস্যা হয়েছে জানলেওয়ালাদের। তারা ফেসবুকে লিখতে লজ্জা পাচ্ছেন। একই গোত্রভুক্ত হবার ভয়তেই এই লজ্জা। তবে তারা লজ্জা পেলেও ফেসবুকারদের বিশেষ একটা শ্রেণীর কোন লজ্জা নেই। লজ্জা এবং শরম বিষয়টি তাদের ধাঁচেই নেই। বিষয় একটা পেলেই তারা ধরেন।

আটঘাঁট বেঁধেই ধরেন। আগস্টের প্রথম থেকে ধরেছেন গরুকে। কোথায় ডেঙ্গু, কোথায় কাশ্মীর আর কোথায়ই বা জাতীয় সঙ্গীত। সবই তুচ্ছ। নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেছে সব। কোরবানীর গরুর সামনে ওসব কিচ্ছু না। বিষয়বস্তু এখন একটাই। কোরবানী আর গরু। এসবই এখন সব। বর্ণনার ধরনও এক; বিশাল গরু ছাগলের হাট। দলে দলে গরু আসছে। আসছে ছাগলও। গরু ভর্তি ট্রাকের পর ট্রাক। বড় গরু, ছোট গরু। শুধু গরু আর গরু। সাথে গরুওয়ালাও। বাদ যায়নি কোন ছবি। শেষমেষ বাজার থেকে কেনা নিজের গরুর ছবি। নানান পোজে তোলা ছবি।

পোজের অন্ত নেই। গলায় ধরে, লেজে ধরে; কিংবা রশি ধরে। গুতা খাওয়ার ছবিও আসে। ছবির পর ছবি। বাদ যাচ্ছে না ভিডিও। সিরিয়াল দিয়ে আসছে। আসছে কোরবানীর ছবি। বড় ছুরি হাতে রক্তমাখা গায়ে কোরবানী। বাসার সামনের রাস্তা লাল করে কোরবানী। তারপর মাংশ; সদ্য কাটা গরুর লাল টকটকা ছোটছোট মাংশের পিস। ভাগে ভাগে সাজানো। এরপরই চামড়া। লবন মাখা সারি সারি স্তুপাকৃতির গরুর চামড়া। বিক্রিত অবিক্রিত সব চামড়া। ভাগ্য ভাল; সবই গন্ধহীন চামড়া। এখনো ফেসবুকে শুধু ছবি আসে; গন্ধ আসে না!!! 

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com