‘বাচ্চাদের আমার মতো করে মানুষ করো’

‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শহীদুল্লা কায়সার একটি ভয়ঙ্কর কাজ করেন। সেদিন রাতে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তা অবরোধ করে। ব্যস্ততায় তিনি বাসায় ফেরার কথা ভুলে যান। চারদিক ছিল অন্ধকার। পুরোপুরি ক্র্যাকডাউন। শহরজুড়ে বিক্ষুব্ধ মানুষের চিৎকার। জগন্নাথ কলেজে গোলাগুলির শব্দ। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে সিদ্দিকবাজারে। ভয়ার্ত রাস্তাঘাট। পাকবাহিনীর অত্যাচারে আহত মানুষের কান্নাকাটি। আর্তনাদ। আগুন। গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। শহীদ মিনার ভাঙ্গা হচ্ছিল। সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি ছিল ঢাকা শহরজুড়ে।

অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চলছিল। সাধারণ মানুষের দাবি ছিল একটাই তারা মুক্তি চান। এই পরিস্থিতিতে বাসায় নেই তিনি। তাঁর জন্য অপেক্ষা। স্বজনরা সবাই উদ্বিগ্ন। কান্নাকাটি। পরিবারের অনেকেই ভেবেছিলেন হয়ত আর ফিরতে পারবেন না শহীদুল্লা কায়সার। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর তান্ডবে পিছপা হননি তিনি। সবাইকে ফেলে আসেননি। বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ দিয়ে রাত আড়াইটায় বাসায় ফিরেন। আন্দোলন-সংগ্রাম আর জীবন ঝুঁকির মধ্যে মোটেও বিচলিত ছিলেন না তিনি। অনেকটাই স্বাভাবিক ছিলেন। বাসায় ফিরে বলেন, সবাইকে নিচে বিছানা করে ঘুমাতে। তাকে দেখে ও কথা শুনে সবাই অবাক!

একজন আপোসহীন মানুষ ছিলেন শহীদুল্লা কায়সার। সব সময় অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন এই সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। কখনও মৃত্যুকে ভয় করতেন না। ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন সংগ্রামী। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ছিল তাঁর আদর্শ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ধারার সকল আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক এই মানুষটি শ্রমিক-জনতার দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য সক্রিয় সংগ্রামের ওপর গুরুত্ব দিতেন। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে শহীদুল্লা কায়সার বাসা থেকে চলে যান। পারিবারিক চাপের মুখেই এমন সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছিল। কিন্তু ১৩ ডিসেম্বর কারফিউ ওঠার আগে আবারও বাসায় ফিরে আসেন তিনি। সবাই অবাক। অজুহাত বই রেখে যাওয়ার। আসলেই তিনি এই মুহূর্তে যেতে চাচ্ছিলেন না। স্ত্রীকে বললেন, ১৪ ডিসেম্বর অর্থাৎ পরের দিন যাব তোমাকে আর আম্মাকে নিয়ে। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, ১৪ তারিখে আমরা বাড়ি থেকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। সেদিন কারফিউ ছিল। ঠিক সন্ধ্যার আগে বাসার সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। দেখলেন দূর থেকে দুজন লোক বাসার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে কি যেন বলছে। মনে খটকা লাগল। দৌঁড়ে এসে শহীদুল্লা কায়সারকে একথা জানিয়েছিলেন স্ত্রী পান্না কায়সার। তাকে বাসা ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যাননি।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাত। কায়েতটুলীর বাড়িতে ছিলাম আমরা। সেদিনও ছিল সবকিছু অন্ধকার। বাড়িতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আত্মীয়স্বজন আশ্রয় নিয়েছিল। সন্ধ্যায় শহীদুল্লা কায়সার ও চাচা শ্বশুর শাহরিয়ার কবিরের বাবা মিলে সোফায় বসে ভয়েস অব আমেরিকা শুনছিলেন। তখন আমি শমীকে দুধ খাওয়াচ্ছিলাম। এমন সময় দরজায় ঠক-ঠক শব্দ। আমার দেবর এসে শহীদুল্লা কায়সারকে বলল, বড়দা দরজায় শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাইরে থেকে দরজা খোলার জন্য বলছে। আমি দরজা খুলতে না করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। শহীদুল্লা কায়সার তখন বলল খুলে দাও। মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে। সব অন্ধকার তখন। মোমবাতি নিয়েই ঘরেও বারান্দায় হাঁটছে। ইতোমধ্যে দরজা খোলা গেছে। আমরা নিচে থেকে কোন শব্দই শুনতে পাচ্ছিলাম না। শহীদুল্লা কায়সার বলছিল কি ব্যাপার কে এলো? ও ভাবল কোন আত্মীয় হয়ত এসেছে। এ কথা বলতে বলতেই নিচতলা থেকে ওরা উপরের দিকে উঠছে। সিঁড়িতে আবার ঠক ঠক শব্দ। উপরে উঠতেই আমাদের বসার ঘর। মোমবাতি জ্বলছিল।

ঘরে ঢুকেই ঘাতকরা জিজ্ঞেস করল, এখানে   শহীদুল্লা কায়সার কে? ওরা শহীদুল্লা কায়সারকে চিনত না। ঘাতকদের সবাই ছিল মুখোশধারী। তখন সে নিজেই নিজের পরিচয় দিল। আমি শহীদুল্লা কায়সার। নিজের পরিচয় দেয়ার পরই তার হাত ধরে হেঁচকা একটা টান দিল। টান দিতেই দুধের শিশু শমীকে আমি ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। দুধের বোতলটাও ছিটকে পড়ে যায়। তখন শমীর বয়স দেড় বছরের কম। ঘাতকরা শহীদুল্লা কায়সারকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি পেছন পেছন আরেকটি হাত ধরে টানছিলাম। কিন্তু তাকে টেনে ধরে রাখতে পারছিলাম না।

ওরা যখন বারান্দায় ওকে টান দিয়ে নিয়ে গেল, তখন আমি বারান্দার সুইচটা অন করে দিলাম। বারান্দাটা আলো হয়ে গেল। পাশের রুমেই আমার ননদ ছিল। ও রুম থেকে অনেক কষ্টে বারান্দায় এসে দুঃসাহসী কাজ করে ফেলে। মুখোশ পরা এক ঘাতকের মুখের কাপড় টান দিয়ে খুলে ফেলে সে। আলোতে আমরা মুখোশ খোলা ঘাতককে চিনে ফেললাম। জামায়াত নেতা খালেক মজুমদার!

ঘাতকরা সময় নষ্ট না করে শহীদুল্লা কায়সারকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে যায়। তখন ওর হাতে আমার হাত ধরা ছিল। টানতে টানতে একপর্যায়ে ওর হাত থেকে আমার হাতটা ছুটে যায়। চলে যাওয়ার সময় একটা কথাই বলল সে ‘ভাল থেকো, সন্তানদের আমার মতো করে মানুষ কর’। বিড়বিড় করে আর কি বলছিল বুঝতে পারিনি। ওরা কিছু বলতেও দিচ্ছিল না।

শহীদুল্লা কায়সার ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারি ফেনী জেলার মাজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লা। তাঁর বাবার নাম মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্ এবং মায়ের নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। ‘সরকারী মডেল স্কুলে’ এবং পরে ‘মাদরাসা-ই-আলিয়া’র অ্যাংলো পার্সিয়ান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ‘প্রেসিডেন্সি কলেজে’। ১৯৪৬ সালে তিনি এখান থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন এবং অর্থনীতিতে এমএ পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একই সঙ্গে তিনি ‘রিপন কলেজে’ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) আইন বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তাঁর বাবা ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ ভর্তি হন। তবে এ ডিগ্রী লাভ করার আগেই পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটান।

রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার কখনও নীতির প্রশ্নে আপোস করেননি বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে হয়েও তিনি তার জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। কী এক জীবন তার! বিলাসী জীবন ত্যাগ করে এসে তার লক্ষ্যই ছিল গরিব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করা।

শহীদুল্লা কায়সার সমসাময়িক রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর লেখা আলোচিত উপন্যাস ‘সারেং বউ’, ‘সংশপ্তক’। -রাজন ভট্টাচার্য

SHARE