যে শোকে আজও কাঁদে ইতিহাস!!!

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট, জাতির দীপ্তকণ্ঠের প্রতিনিধি, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে। যে শোকে আজও কাঁদে ইতিহাস। ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে ভয়াবহ এক শোকের দিন। যে শোক ভোলা যাবে না কোনদিন। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের ভোরে, গভীর শোকে কেঁদে উঠেছিল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে সেদিন বাংলার মানুষকে কাঁদতে দেখেছি।

সংঘাতময় এ পৃথিবীতে, আবহমানকাল ধরে চলে আসছে, ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত, সুন্দর-অসুন্দরের সংঘাত, ঘৃণা-ভালবাসা, শান্তি-অশান্তি, অসুর আর মানবতার সংঘাত। নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরস্পরায় চলে আসা ইতিহাসের আমোঘ ধারায়, ন্যায় এবং সত্যকে বার বার মোকাবেলা করতে হয়েছে অন্যায়-অসত্যকে, ভেতর বাহিরের কুটিল ষড়ষন্ত্রকে। এ সংঘাত মোকাবেলায় কত মহাপুরুষের রক্তে ভিজে গেছে পৃথিবীর বুক, সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাসের ভয়াবহ সঙ্কট, বিপন্ন হয়েছে মানবতা, যার ইয়ত্তা নেই।

আততায়ীর হাতে মহাপুরুষের মৃত্যুবরণ যেমন সংঘাতের এক অনিবার্য ঘটনা, তেমনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা আবহমানকাল ধরে চলে আসা ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত এবং ছক বাঁধা এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন।

’৭৫ এর ১৫ আগস্ট অন্ধকারের পেটচিড়ে যখন বেরিয়ে আসে সোনালি ভোর, কিচির-মিচির শব্দ করে রাতজাগা পাখিগুলো ঘোষণা করছে রাতের শেষ প্রহর, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি, তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। মীর জাফরের রক্তের কণিকা বহনকারী কিছু উচ্চাভিলাষী, বিপথগামী ও উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্য স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের সহায়তায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে সময়ের নির্ভীক পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। পবিত্র জুমার দিন, ফজরের নামাজের সময় হত্যা করল একজন শ্রেষ্ঠ মানবকে, একজন উদারচিত্তের মানবতাবাদী মহৎ মানুষকে। বাঙালী জাতি হারাল তাদের জাতির জনককে, বিশ্ব হারাল এক মহান নেতাকে।

এই নৃশংস হত্যাকান্ড ও বিভীষিকার ভয়াবহতা বোঝার ভাষা নেই। পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শব্দ উজাড় করে দিয়েও এই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা যাবে না। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট অসুরের দল শুধু জাতির জনককেই নয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আরও হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, জীবনের সুখ দুঃখের সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল এবং সর্ব কনিষ্ঠ শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে।

কচি মুখ, মায়াবী চোখ, নির্মল হাসির অবুঝ শিশু রাসেলের বাঁচার আকুতির বিনিময়ে ঘাতকরা কচি বুকটা ঝাঁজরা করে বুলেটের আঘাতে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তারও বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় মেঝে, মাঝখানে নীরব, নিথর, প্রাণহীন অবস্থায় পড়ে থাকে ক্ষত-বিক্ষত দেহ। শিশু রাসেল অসুরদের বাধা দিতে পারেনি, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে নীরবে। এছাড়া তার আর কোন উপায় ছিল না।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট প্রকৃত অর্থে কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। ছিল ১৭৫৭ সালের ইংরেজ বেনিয়াদের ষড়যন্ত্র ও দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত বিয়োগান্ত নাটকেরই পুনরাবৃত্তি। যাঁর যৌবনের উত্তাপে গড়া এ সোনার বাংলা, তাঁর রক্তাক্ত লাশ সিঁড়িতে ফেলে রেখে খুনীর দল এগিয়ে যায় ক্ষমতার মসনদের দিকে। যাঁর সারা জীবনের এত সাধনার ধন, সোনার বাংলা, তাঁর অস্তিম যাত্রায় কফিন আচ্ছাদিত হয়নি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায়, বিউগলে বেজে ওঠেনি শেষ বিদায়ের করুণ সুর। যাঁর সারা জীবনের ত্যাগ ও শ্রমের ফসল বাঙালী জাতির স্বতন্ত্র আবাসভূমির ঠিকানা, তাঁর সমাধির জন্য রাজধানীতে জোটেনি সাড়ে তিন হাত জায়গা। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত  লাশ খুনীদের উল্লাস নৃত্যের মধ্য দিয়ে মাটিচাপা দেয়া হয় নিজ জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায়। আজ সময়ের ব্যবধানে টুঙ্গিপাড়া হয়ে উঠেছে বাঙালী জাতির তীর্থস্থান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখলে মনে হয় স্বাধীনতার সোনালি ইতিহাস গায়ে জড়িয়ে সারা বাংলা ঘুমিয়ে আছে টুঙ্গিপাড়ার সবুজ মাঠে।

’৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনার আকস্মিকতায় সমগ্র জাতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং এর প্রতিবিপ্লব ঘটাতে পারেনি, এ কথা সত্যি। কিন্তু হিমালয় পর্বতের ন্যায় যার ব্যক্তিত্ব, আকাশের উদারতা আর সাগরের বিশালতায় সারা বাংলাজুড়ে যার অস্তিত্ব, ইতিহাস থেকে তাঁর নাম, তাঁর অবদান, তাঁর গৌরব রক্তপাত ঘটিয়ে বিলুপ্ত করা যায় না। সময় যাঁর হাতে তুলে দিয়েছে কীর্তি ও গৌরবের পুরস্কার, ইতিহাসে যাঁর নাম রয়েছে লেখা স্বর্ণাক্ষরে, তাঁর কৃতিত্ব, তাঁর যশ তাঁকে হত্যা করে মুছে ফেলা যায় না। বরং সে গৌরবের দীপ্তি ও মর্যাদা আরও বেড়ে যায়।

আর হত্যাকারীদের স্থান হয় মানুষের সীমাহীন ঘৃণা ও ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। ’৭৫ এর প্রধান মীর জাফর খন্দকার মোশতাক হতে চেয়েছিল একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু মাত্র ৮১ দিনের মাথায় মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চুরির দায়ে জেলে যায়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আপন বাসভবনে বন্দী অবস্থায় নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা এবং বিবেকের দংশনে মানুষের আদালতকে ফাঁকি দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। পিতার অপকর্মের দায়ে, ক্ষোভে আর ঘৃণায় মোশতাকের সন্তানরা দেশ ছেড়ে চলে যায়। অন্য মীর জাফরদের শেষ পরিণতি আরও করুণ।

সংঘাতময় এ পৃথিবীতে কখনও কখনও ন্যায় এবং সত্য পরাভূত হয়েছে অন্যায়-অসত্যের কাছে, বিবেক বন্দী হয়েছে বর্বরতায়, নৈতিকতা, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ বিপন্ন হয়েছে, কিন্তু তা সাময়িক। বিভ্রান্তির ঘোর কেটে যাওয়া মাত্রই মানুষের মাঝে ফিরে আসে বিবেকের অনুভূতি, বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে অনুশোচনা, পুঞ্জীভূত গ্লানি আর দুঃসহ যন্ত্রণার।

আমরা কেউ ইতিহাসের ছাত্র, কেউ শিক্ষক, কেউ একটি পাতা, কেউ একটি অধ্যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজে এক ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস, ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। ইতিহাসের এই কিংবদন্তিকে হত্যা করে যারা বদলে দিতে চেয়েছিল ইতিহাসের ধারা, তারা জানে না হত্যা করেই থামানো যায় না ইতিহাসের পথচলা। সময়ের হাত ধরে আঁধার পেরিয়ে ইতিহাস এগিয়ে যায় পায়ে পায়ে।

ইতিহাসের হাত ধরেই সময়ের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু কবর থেকে উঠে এসেছেন তাঁর প্রিয় সোনার বাংলায়, তাঁর প্রিয় মানুষের কাছে। ইতিহাসের রক্তগোলাপ হয়ে ফুলে-ফলে, ফসলের মাঠে, কৃষকের হাসি, রাখালের বাঁশি, মাঝির ভাটিয়ালি গানে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারিত মিছিল, কবিতার আসরে, নাটকের মঞ্চে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব। কে রুখে তাঁর দুর্বার গতি, কার আছে এমন সাধ্য? যতদিন বাংলার মাটি, মানুষ, বৃক্ষ, আকাশ, প্রকৃতি থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে, বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে, অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে। -ফজলুল হক খান, বীমা কর্মকর্তা

SHARE