যাঁর গীতসুধা রসে বাঙালি স্নাত

মফিদুল হকঃ সন্জীদা খাতুন গানের মানুষ, আরও নির্দিষ্ট করে বললে রবীন্দ্রনাথের গানে সমর্পিত ব্যক্তিসত্তা। রবীন্দ্রনাথের গানের রূপকার আছেন অনেক, কিন্তু সঙ্গীতের ভেতর-বাহির মিলে গানের গূঢ়ার্থ ও বৃহদার্থের রূপায়ণ করার মতো শিল্পী বিশেষ মেলে না, তেমন ব্যতিক্রম আমরা পাই সন্জীদা খাতুনের জীবনভর সঙ্গীতসাধনায়।

দশকের পর দশকজুড়ে তিনি সঙ্গীতরসে স্নাত করেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের বাঙালি শ্রোতাদের। তবে গানের অতিরেকে যে-সঙ্গীত-সংস্কৃতি সেখানেই বোধ করি সন্জীদা খাতুনের অনন্যতা ও সৃষ্টিশীল অবদান পেয়েছে সবচেয়ে বড় সার্থকতা। আমরা খুব সহজভাবে যা পেয়ে যাই অনেক সময় তার তাৎপর্য সম্যক বুঝে উঠতে পারি না। সেজন্য সন্জীদা খাতুনের সঙ্গীত ও জীবনসাধনা বড় পরিসরে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

গান ছিল তার পরিবারে সহজিয়াভাবে, অঙ্কশাস্ত্রে সুপন্ডিত বিজ্ঞানচিন্তাবিদ পিতা ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন পরিবারে বয়ে এনেছিলেন উদার ও মুক্ত আবহ। সংস্কৃতি-স্নাত পরিবারের এই কন্যা রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে পড়বার আগ্রহ ও জেদ বহন করছিলেন অন্তরে  এবং পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে বিশ্বভারতী থেকে বাংলায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। গান তো ভেসে বেড়ায় শান্তিনিকেতনের আকাশে-বাতাসে। একদিকে সাহিত্যের পঠন-পাঠন, রাবীন্দ্রিক শিক্ষাদর্শনে স্নাত হওয়া, আরেক দিকে গান এবং গান ঘিরে নানা আয়োজন ও অনুষ্ঠান, সব মিলিয়ে সঙ্গীত-সংস্কৃতির আরেক উদ্ভাসন ঘটে তার মধ্যে।

তিনি যখন ফিরে আসেন ঢাকায়, গানেরই মানুষ সংস্কৃতিবেত্তা কর্মীপুরুষ ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গড়ে তোলেন যুগলজীবন গানের এক ফল্গুধারা উৎসারিত হবে, সেটা স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা গিয়েছিল। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ ঘিরে মুখোমুখি দাঁড়াল সমাজ ও রাষ্ট্র, কঠিন যে-পরিস্থিতিতে গান নিয়েই সংস্কৃতিজনেরা গড়ে তুলতে চাইলেন প্রতিরোধ।

অভিনব এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ছিল নানা মাত্রা, সেক্ষেত্রে গানের মানুষ সন্জীদা খাতুন যেমন সঙ্গীতের গভীরে প্রবেশের সাধনায় নিবিষ্ট হলেন, তেমনি গান ঘিরে সমাজের শক্তি প্রসারেও অবদান রাখলেন। একদিকে তিনি সঙ্গীতের শুদ্ধতা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়কী, গানের ভাব-বিশ্লেষণে নবতর মাত্রা যোগ করতে সচেষ্ট হলেন, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঘিরে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে প্রেরণাদাত্রী হয়ে উঠলেন। এরপর থেকে সন্জীদা খাতুনের সাঙ্গীতিক অভিযাত্রা এবং জাতির মুক্তি-পথ পরিক্রমণ চলেছে হাতে হাত রেখে। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ আয়োজন থেকে জন্ম নেয় ছায়ানট, অনেকেই সেখানে যুক্ত হন, তবে গানের ভিত শক্তভাবে নির্মাণ করে অসংখ্য শিক্ষার্থীর দ্বারা শিল্পের পরম্পরা তৈরিতে তার ভূমিকাই মুখ্য। আরও নানাভাবে ব্যাপ্তি পেয়েছে তার এই সাংস্কৃতিক ভূমিকা।

ছায়ানট থেকে সন্জীদা খাতুন বিস্তারিত হয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদে, দেশব্যাপী চারণের মতো বিতরণ করে চলেছেন সঙ্গীতসুধা। রবীন্দ্রসাহিত্য-কবিতা-সঙ্গীত বিশ্লেষণে হয়েছেন গভীরতা-সন্ধানী, কবিতার ধ্বনিরূপ সন্ধান করে সাহিত্য সমালোচনায় নতুন মাত্রা তিনি যোগ করেছেন, পাশাপাশি লিখেছেন সঙ্গীত, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিশ্লেষণী প্রবন্ধ। জাতীয় জাগরণে শিক্ষার ভূমিকা এবং লোকায়ত জীবনের সঙ্গে শিক্ষার্থীর যোগ ফলপ্রদ করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছেন ব্রতচারী আন্দোলন পুনঃপ্রসারে।

সাম্প্রদায়িকতার যে কোনো আঘাতে তিনি বিচলিত বোধ করেন বরাবরের মতোই, অবস্থান নেন সম্মিলিত প্রতিরোধে। সেইসঙ্গে তার সমস্ত কাজে জড়িয়ে থাকে গানের পরশ, গান দিয়ে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন জাতিকে। অনেককে নিয়ে তার যে সঙ্গীতসাধনা, অনেক শিল্পী গড়বার জন্য তার নিরন্তর সাধনা, শিল্পী যেন শিল্পকে পান পূর্ণরূপে এবং শিল্প যেন নিবেদিত হয় জীবনে পূর্ণতার স্পর্শ বয়ে আনতে, সেজন্য রূপসাগরে ডুব দিয়েছেন তিনি, তবে অরূপরতন বয়ে এনেছেন সবার জন্য, সব বাঙালির জন্য, গোটা জাতির জন্য।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী রয়েছেন অনেক, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের ভাবসম্পদ এমন ব্যাপ্তি ও নিবিড়তা নিয়ে অনুভব ও অনুধ্যান করার মতো শিল্পী বিশেষ নেই। আর গান নিয়ে ব্যক্তিজীবন, সমষ্টিসত্তা ও জাতিজীবন আলোড়িত করার মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধক উপমহাদেশজুড়ে রয়েছেন একজনই; শিল্পচেতনা ও জীবনধারণার বিশালত্বের ব্যাখ্যাকার ও রূপকার সেই অনন্য শিল্পী সন্জীদা খাতুন। জয়যুক্ত হোক তার শিল্পসাধনা।

SHARE