কেন বিমানবন্দরে সংবর্ধনার আয়োজন?

যে ঢাকা শহরে যানজটে নাগরিকরা প্রতিদিন নাকাল হচ্ছে, জীবন-জীবিকা থমকে দাঁড়ানোর উপক্রম হয়েছে সেই শহরে যখন কোনো দলীয় প্রধান বা সরকার প্রধানকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য বিমানবন্দর সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়, দলীয় ব্যানারে নেতাকর্মীরা বিমানবন্দর রোডে উল্লাস প্রকাশ করে, সংবর্ধিত নেতা তাকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তৃতা করেন তখন গোটা ঢাকা শহরে যানজটে আটকে পড়া মানুষদের ক্রোধান্বিত প্রতিক্রিয়া সেই নেতা বা নেত্রী কতটা জানেন বা জানার চেষ্টা করেন তা জানি না, তবে যে অবর্ণনীয় দুঃখে-কষ্টে লাখ লাখ মানুষ পড়েন তার কোনো উত্তর সংবর্ধিত নেতানেত্রীরা বোধ হয় জানতেও চেষ্টাও করেন না। যদি করতেন তাহলে নিজ থেকেই তাদের এসব সংবর্ধনার আয়োজন বন্ধ করার নির্দেশ থাকত। আমাদের জাতীয় নেতানেত্রীগণ যে ঢাকা শহরের খোঁজ-খবর খুব একটা রাখেন না, জানেনও না তা তাদের তথাকথিত সংবর্ধনা নেওয়ার মানসিকতা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

দলীয় প্রধান বিদেশে নানা কাজে যাবেন-আসবেন এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু দেশে ফেরার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা সংবর্ধনা জানাতে রাস্তাঘাট ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ করে রাখবেন, হাজার কয়েকশ নেতাকর্মী বিমানবন্দর ভিআইপি সড়কে নাচা-নাচি করবেন, এর চাইতে পরিহাস ও অবিবেচকের কাজ দ্বিতীয়টি হতে পারে না। কোনো বিশেষ কারণে দলীয় প্রধানকে যদি সংবর্ধনা দিতেও হয় তাতে কারও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেটি বিমানবন্দরে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে দিতে হবে কেন, কেন অন্য কোনো বিশেষ জায়গায় নয় যেখানে মানুষদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না, মানুষ নাকাল হবে না, কষ্টে পড়বে না।

বাংলাদেশে বিমানবন্দরে বড় দলগুলোর নেতানেত্রীদের সংবর্ধনার নামে যখন এমন অবর্ণনীয় দৃশ্যের অবতারণা প্রায়ই করতে দেখি তখন সত্যিই দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ ও লাঞ্ছনায় কাঁদতে ইচ্ছে করে। বস্তুত দলগুলোর মধ্যে বাস্তবতাবোধের চূড়ান্ত অধঃপতন দেখে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে যে, এই দেশের বড় বড় দলগুলো এবং তাদের নেতারা আসলেই একুশ শতকের জন্য উপযুক্ত মানুষ কি না। নেতারা কি আসলে জানেন যে, তাদেরকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য যারা আসেন তাদের বেশিরভাগই বিশেষ ব্যবস্থাপনায়, কারও না কারও সমর্থক প্রদর্শনের জন্যে আনা হয়।

মূল নেতা বিমান থেকে নেমে ৫-১০ মিনিট এসব নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে কিছু কথা বলেন, হাসি দেন, উৎফুল্ল− প্রকাশ করেন। ততক্ষণে পুরো বিমানবন্দর ভিআইপি সড়কসহ হয়তো ঢাকা শহরের অনেকটাই যানজটে নাকাল হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ তিন-চার ঘণ্টা ধরে রাস্তায় আটকে থাকেন, গরমে অনেকেই ছটফট করছেন, কোনো রোগীর অ্যাম্বুলেন্সের এগোবার সুযোগ থাকে না। নেতানেত্রী ও কর্মীরা ফূর্তি করতে করতে যখন চলে যান তখনো জনসাধারণ গাড়িতে আটকে থাকেন। এই জট ছাড়তে ৩/৪ ঘণ্টায়ও অনেক সময় সম্ভব হয় না। কিছুদিন আগে জাতীয় পার্টি প্রধান হুসাইন মুহম্মদ  এরশাদ ৫ দিনের ভারত সফর শেষে ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন। তাকে সংবর্ধনা দিতে জাতীয় পার্টির কয়েক হাজার লোক বিমানবন্দর সড়কে অবস্থান নেয়। আমরা বিকাল সাড়ে চারটায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গাড়িতে বের হয়ে খুব বেশিদূর এগোতে পারিনি । পরে জানা গেল এরশাদ সাহেবকে তার দল সংবর্ধনা দিচ্ছে বিমানবন্দরে। রাত ৯টার আগ পর্যন্ত গাড়ি একই জায়গায় অবস্থান করেছিল।

অবশেষে ধীরে ধীরে চলা শুরু হয়। রাত সাড়ে দশটায় উত্তরায় প্রবেশ করি। যারা ঢাকার এ প্রান্ত ও প্রান্তে যাওয়ার ছিলেন তাদের বাসায় যাওয়া কতটা অনিশ্চিত এবং গভীর রাতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা কি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ একবারও জেনেছেন। কত নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী এক অবর্ণনীয় দুর্দশার শিকার হলেন, অসংখ্য গাড়ি তেল গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে অকেজো হয়ে পড়ে রইল, অনেকে গাড়ি ছেড়ে হেঁটে হেঁটে এগোতে বাধ্য হলো, মাঝে মাঝে বৃষ্টি খানাখন্দর ভেঙে মানুষকে পায়ে হেঁটে রাস্তা ভেঙে ভেঙে যেতে হলো। এই কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণার শিকার যারা হয়েছেন তারাই কেবল বলতে পারবেন।

আমাদের নেতানেত্রীরা জনগণের কথা বলেন, অথচ নেতানেত্রীরা একটি হাস্যকর সংবর্ধনা নেওয়ার জন্য ঢাকা শহরে কী অবর্ণনীয় যানজট সৃষ্টি করেন, তাতে কত মানুষের গালমন্দের শিকার তাদের হতে হয়, সেটি নেতারা কতটা জানেন জানি না। হয়তো জানতে চানও না।

সরকারের উচিত ঢাকা বিমানবন্দরে কোনো দলীয় প্রধান, এমনকি সরকার প্রধানেরও বিদেশ থেকে আগমন ও প্রস্থান উপলক্ষে যানজট সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা। আর নেতানেত্রীদের সংবর্ধনার নামে এমন পরিহাসের সুযোগ না দেওয়া, যানজটে নাকাল হওয়া মানুষকে ভয়াবহ অবস্থায় আর ঠেলে না দেওয়া, স্বস্তিতে থাকতে দেওয়া। সরকারের উচিত এ বিষয়ে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া। -মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE