এবার ডিজিটাল দেশ গড়বে ডিজিটাল নারী

জান্নাতুল মাওয়া সুইটিঃ নবনীতা একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেছেন। এরপর চাকরির জন্য চেষ্টা করতে থাকলেও মনমতো চাকরি খুঁজে না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। ঠিক সে সময় চাকরির আশায় বসে না থেকে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন তিনি। নবনীতা বলেন, ‘বিশ^বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যখন চাকরি খুঁজছি, তখন আমি নিজ উদ্যোগেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়টি জানার চেষ্টা করি। এরপর আমি আপওয়ার্কে এ্যাকাউন্ট চালু করি।

এই তো দু’বছর আগের কথা। স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার উদ্দেশ্যে আমি কাজের ক্ষেত্র হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংয়ের বিষয়টিকেই বেছে নিয়েছি। ফার্মেসি বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কেট রিলেটেড প্রচুর কাজ থাকে। সেগুলো থেকেই বেছে বেছে কাজ করতে থাকি। যদিও শুরুর দিকে কাজের রেট বেশ কম পেতাম। তবে দিন দিন যত অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে, কাজের রেটও বাড়তে থাকে। এখন গড়ে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ করি। তবে কাজ বেশি করলে পেমেন্টও বেশি পাওয়া যায় স্বাভাবিকভাবেই।’

নবনীতার বিষয়ভিত্তিক কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার ইনফরমেশন ডেভেলপমেন্ট, ডক্যুমেন্টেশন, মেডিক্যাল রিসার্চ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ডাটাবেজ ডেভেলপমেন্ট, এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ টাস্ক ইত্যাদি। নবনীতার মতে, যেসব মেয়ে যোগ্যতা এবং ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণে চাকরি করতে পারছেন না, তারা ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের মতো করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেন।

সাধারণ লেখাপড়ার পর গতানুগতিক চাকরির দৌড়ে শামিল না হয়ে নবনীতার মতো অনেক নারী তথ্য ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করছে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশে বেশ কিছু সফটওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠান, অনলাইনভিত্তিক শিক্ষামূলক ও বাংলা ভাষায় সামাজিক যোগাযোগ পোর্টাল গড়ে উঠেছে, যেগুলোর পরিচালনায় রয়েছে নারী উদ্যোক্তারা। বলতে গেলে তথ্য প্রযুক্তির এ বিশাল ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। আইসিটি বা তথ্যপ্রযুক্তিতে পুরুষদের পাশাপাশি বর্তমানে নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছেন। কিছু দিন আগেও এ খাতের শিক্ষা, সেবা ও ব্যবসা ছিল পুরুষদের দখলে। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। আধুনিক বিশ্বে উন্নয়নের অন্যতম উপাদান তথ্য ও প্রযুক্তি। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের চেয়ে এগিয়ে আছে। বর্তমানে দেশের নারীরা প্রযুক্তিবান্ধব হয়ে উঠছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক প্রশিক্ষণে শতকরা ৩০ ভাগ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার হিসেবে উন্মুক্ত হয়েছে আইসিটি বিভাগ। দেশের নারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব পোর্টাল, কল সেন্টার, মোবাইল এপ্লিকেশন, সামাজিক যোগাযোগসহ নানা ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় অংশগ্রহণ করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে কম্পিউটার কৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্সের মতো বিষয়গুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। গার্মেন্টস বা গৃহস্থালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীদের পদচারণা বাড়ছে প্রযুক্তিবিষয়ক কাজে।

আইসিটি খাতে একজন নারী যদি তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন তবে সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ধর্মীয় গোঁড়ামি অনেকাংশে কমে আসবে। ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ জরুরী। সম্প্রতি তথ্য প্রযুক্তি খাতে অনেক পরিবর্তন ঘটছে। ইতিমধ্যেই, গ্রামগঞ্জে আইসিটি খাতে নারীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে একুশ শতকের উপযোগী দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের লক্ষ্য ’২১ সালের মধ্যে দেশে আইটি পেশাজীবীর সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা।

নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে সারাদেশে লার্নিং ও আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর আগে এ প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এখন অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আইটি সেন্টারের প্রধান হিসেবে কাজ করছে নারীরা। নারীরা এখন প্রযুক্তি রিলেটেড কর্পোরেট পেশাকে স্বাচ্ছন্দ্যে বেছে নিচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে নারীদের আরও প্রযুক্তিবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মেয়েদের শুধু অংক, ইংরেজী ও বিজ্ঞানে ভাল জানলে হবে না। তাদের প্রযুক্তিতে কম্পিউটার কোডিং এবং প্রোগ্রামিংও শিখতে হবে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব দিতে হবে। আগামী দুই বছরে দুই লাখ নারীকে প্রযুক্তি শিক্ষায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ার টার্গেট নেয়া হয়েছে।’

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অল্প শিক্ষিত নারীরা স্বল্প কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব সাইট ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন কাজে সাফল্য আনছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনশক্তিকে প্রযুক্তির জ্ঞানে জ্ঞানী করতে পারলে তারা আমাদের বোঝা হবে না, তারা হবে দেশের সম্পদ। নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। কারণ নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন যেমন প্রযুক্তি জ্ঞান ছাড়া সম্ভব না, তেমনি নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি সম্ভব নয়। আমাদের দেশে অনেক নারী ঘর থেকে বের হতে চায় নয়। তারা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পেলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের ঘরে বসে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল অর্থ আয় করতে পারবে যা আমাদের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে।

SHARE